‘বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন কাল থেকেই পয়লা বৈশাখ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি সার্বজনীন উৎসবের দিন হিসেবে স্বীকৃত। সম্রাট আকবরের শাসনামলে তারই নির্দেশে ৯৯৮হিজরী (১৫৮৪ খ্রি.) সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে ‘ফসলী সন’ হিসেবে এর প্রবর্তন করেন-বাংলার তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী-যা এখন আমরা বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে ব্যবহার করছি। আর কয়দিন পরেই বাংলা নববর্ষ-১৪২৫-যা আমাদের জাতিসত্তার অংশ হিসেবে পরিগণিত। একসময় এই দিনটি আমাদের কাছে ছিল গৌরব ও অহঙ্কারের, জাতিতে-জাতিতে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার আমেজে ভরে উঠতো এই দিনটি; হিসাব চুকিয়ে আগামীর জন্য প্রত্যয় গ্রহণ, স্বজনদের আপ্যায়ন, গরীব-ধনী সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ, মুসলিম তার দ্বীন-শরীয়ত অনুযায়ী, হিন্দু তার ধর্ম অনুযায়ী পূর্ণ বছর মঙ্গলময় জীবন কামনায় প্রভূর কৃপা লাভের জন্য মেতে উঠতো হাজারো আয়োজনে। এই-ই ছিল বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য। অথচ আমরা কি দেখছি? সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন এসে যায়-বাংলা নববর্ষের এই পাঁচশ’বছরের ঐতিহ্য বিলীন করা হচ্ছে কার স্বার্থে!
গত ০৬ই এপ্রিল-২০১৮, বাদ আসর নেছারাবাদ দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা নববর্ষ ১৪২৫’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. এর একমাত্র ছাহেবজাদা আমীরুল মুছলিহীন হযরত মাওলানা মুহম্মদ খলীলুর রহমান নেছারাবাদী হুজুর এ কথা বলেন।
নেছারাবাদী হুজুর বলেন-‘এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নামে আমাদের ঐতিহ্য বিরোধী যে ভোজনবিলাসী ‘পান্তা-ইলিশ’ সংস্কৃতি আর উল্লুক-ভল্লুক সেজে ‘মঙ্গল-শোভাযাত্রা’, যুবক-যুবতীর বেলেল্লাপনা, মদমত্ততাসহ এমনকিছু প্রথার প্রচলন করা হচ্ছে-তা কেবল বাঙ্গালী সংস্কৃতির মূলেই কুঠারাঘাত করেনি বরং থার্টিফার্স্ট, কন্যা-উৎসব, পার্টি-কনসার্ট ইত্যাদি বিজাতীয় অপসংস্কৃতির আদলে বেলেল্লাপনার দুয়ার খুলে জাতির তরুণ-সম্ভাবনাকে নস্যাত করে দিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে-কোনো বেলেল্লাপনাই সংস্কৃতির অংশ নয়। একটি জাতির জীবনাচারের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে সংস্কৃতি। যেখানে সাধারণ মানুষ তিনবেলা খেতে পায় না এবং এই অভাব-অনটনের পরেও স্রষ্ট্রার কাছে নতজানু, সেখানে কতিপয় ভোগবাদী, মদমত্ত সাংস্কৃতিক ধূর্তবাজ ঐ ‘পান্তা-ইলিশ’ আর ‘মঙ্গল-শোভাযাত্রা’র প্রচলন করে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থের জন্যই-আপনাকে, আমাকে এমনকি, রাষ্ট্রযন্ত্রকেও ব্যবহারের অপচেষ্টা করছে।’
নেছারাবাদী হুজুর বলেন-‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ যে, তিনি বাঙালি জাতির ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে ইতিমধ্যেই পান্তা-ইলিশকে নিরুৎসাহিত করাসহ মুখোশ পরিধান ও বিকেল পাঁচটার মধ্যে আয়োজন শেষ করার যুগন্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন; সেইসঙ্গে ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মহোদয়কেও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি যে, তিনি গতকাল তার কার্যালয়ে আগত ঝালকাঠির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে এইমর্মে আস্বস্ত করেছেন যে, নববর্ষের নামে ঝালকাঠিতে জাতীয় ঐতিহ্য ও সমাজ বিরোধী কোনো কর্মকা- হতে দেয়া হবে না।’
নেছারাবদী হুজুর বলেন-‘সাম্প্রতিক সময়ে যে সামাজিক অবক্ষয় আমরা লক্ষ্য করছি, বিশেষত খুন-ধর্ষণ, নারীনিপীড়ন, মাদকাসক্ততা ও পারিবারিক বিপর্যয়-তা স্মরণ করলেও গা শিউরে ওঠে। এমতাবস্থায় নববর্ষকে সামনে রেখে আমরা যদি সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তদের পাতা ফাঁদে পা বাড়াই, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে নাস্তিক, ভোগসর্বস্ব বস্তুবাদী সংস্কৃতির হাতে ছেড়ে দেই, তাহলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এর খেসারত আমাদেরকেই দিতে হবে। আসুন, বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী প্রাণের আলোয় আমরা স্পন্দিত হই, জাতীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করি।’


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন